চুমু নিয়ে একটি
মেগা-ন্যারেটিভ
ভাবলাম শপিংমলের ওই সিন্ডারেলাকে বলেই ফেলি এই ঝিমলি একটা
চুমু দিবি।ভাবতে ভাবতেই হাঁটতে লাগলাম চুম্বনের ডাউনস্ট্রিম ধরে। দেখলাম
মানব-সভ্যতা আগাগোড়া চুমু দিয়ে গড়া। গ্রিস ও রোমের চুমু নিয়ে লেখা হল একটা ট্রয়ের
যুদ্ধ। ক্লিয়োপেট্রাও দেখেছিল জুলিয়াস সিজার না অ্যান্টনি কার হামিতে বেশি তরমুজের
রক্ত। রামায়ণে অরণ্যসুন্দরী শূর্পনখা শ্রীরামের চুমু প্রার্থনা করেছিল আর বাবু
শ্রীরঘুনন্দন লক্ষ্মণকে দিয়ে কিনা তার নাক-কান কেটে নিল। এ কোনদেশি বিচার ভাই।
দেখো তার ফলাফলটাও কী মারাত্মক। রাবণ এসে সীতাকে হরণ করে নিয়ে গিয়ে দশ দশটা মুখ
নিয়ে তার চুমু খাবার জন্যে অস্থির হয়ে পড়ল। কিন্তু সীতা কিছুতেই রাজি হল না। অথচ
রাবণ সুযোগ পেয়েও কখনোই গায়ের জোর খাটাল না। আর্যপুত্র আর রাক্ষসরাজের এই হল
আচরণগত পার্থক্য।
আবার সীতা রাবণকে ঠেকিয়ে যে চুমুগুলো রামের জন্যে যত্ন করে
ন্যাপথলিনে মুড়ে তুলে রাখল চৌদ্দ বছর ধরে, রাবণকে হত্যা করে রাম সেই সব চুমু
চেটেপুটে তো খেলোই সঙ্গে সীতার পেটে জোড়া বাচ্ছা এনে দিয়ে যেই পাব্লিক বলল ওসব
চুমু রাবণের এঁটোকাঁটা ব্যাস রাম সঙ্গে সঙ্গে গর্ভবতী সীতাকে আবার বনবাসে পাঠিয়ে
দিয়ে ভবিস্যতের জন্যে রামরাজ্যের মডেল তৈরি করে দিয়ে গেল।
এদিকে মহাভারত পর্বে এসে মহামুনি পরাশর এক মেছেনির চুমু
কামনা করে তাকে মৎস্যগন্ধা থেকে যোজনগন্ধ্যা বানিয়ে নিয়ে তার হামিতে হাবুডুবু খেতে
খেতে ব্যাসদেবের জন্ম দিল সেই ব্যাসদেব আবার তার মায়ের নির্দেশে দু-ভাদরবউয়ের হামি
খেতে খেতে তাদের প্রেগন্যান্ট করেই ক্ষান্ত হল না এক সুন্দরী দাসির চুমু খেয়ে
তাকেও আঁতুরড়রে পাঠিয়ে দিল।
আবার দেখুন কুন্তি কেমন কুমারী অবস্থাতে সূর্যদেব আর বিয়ের
পর ধর্ম এবং ইন্দ্রর সঙ্গে জুটে গিয়ে চুমু-কেলেঙ্কারির নতুন কেচ্ছা লিখে ঢুকে পড়ল
আদর্শ সতীনারীদের তালিকায়। তার আগে অবশ্য ইন্দ্র ও রামের চুমু খাওয়া অহল্যা এবং পরে দেওরকে বিয়ে করা
তারা আর মন্দোদরী জায়গা করে নিয়েছিল। সতীত্বের লিস্টে কুন্তিরও আগে অবশ্য আরো
একজনের নাম ছিল। দ্রৌপদী। সেই দ্রৌপদী যে কিনা ধর্ম মতেই পাঁচজন স্বামীর চুমুতে
ভেসে যাবার পরেও মনে মনে কর্ণের অধরসুধাও কামনা করেছিল। ভীমতো আবার রাম-লক্ষ্মণের
পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে শূর্পনখারই এক তুতো-বোনকে বিয়ে করল। অর্জুনও কি কিছু কম
গেল! প্রথমে এক ট্রান্সজেন্ডার নারী পরে এক নাগকন্যার চুমুর সঙ্গে সহবাস করে
মহাভারতের ঘটনায় কত বৈচিত্র এনে দিল।
পুরাণে আবার নিজেরা সম্মুখ সমরে অসুরদের সঙ্গে পেরে না উঠে
স্বর্গের সব দেবতা মিলে এক দেবীকে তাদের সামনে এগিয়ে দিল আর দেবতাদের চক্রান্ত
বুঝতে না পেরে সেই রূপমতী নারীকে চুমু খেতে গিয়ে
অসুরদাদারাও দলে দলে প্রাণ দিল।
অমন যে যোদ্ধা-কৃষ্ণ বৃন্দাবন কাণ্ডে তাকে প্রেমিক-কৃষ্ণ
বানাতে তার কাছ থেকেও সব অস্ত্র-শস্ত্র কেড়ে নিয়ে বদলে তার হাত তুলে দেওয়া হল
বাঁশি আর সেই বাঁশির আওয়াজ শুনে ছুটে আসা ব্রজধামের গয়লা-বৌদের চুমু খাওয়া নিয়ে
শ্রীকৃষ্ণের সেকী মাতামাতি তাদের সঙ্গে গোবিন্দের কত ফষ্টিনস্টি সেই গল্পে কবি
জয়দেব তো গোপবধূ রাধাকে নায়িকা বানিয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে তার রোম্যান্স নিয়ে
গীতগোবিন্দ কাব্যটাই লিখে ফেলল যেখানে আবার কিনা একটা চুমু খাবার জন্যে অমন
শ্রীবিষ্ণুর অবতারকে দিয়ে সামান্য এক গয়লানির পদসেবা করিয়ে বলালো –
দেহিপদপল্লবমুদারম। তাই শুনে সমাজের কর্তাবাবুদের রাগ কত ডিগ্রি চড়ে গিয়েছিল
ভাবুন। তাদের শান্ত করতে জয়দেব আবার এক গল্প ফেঁদে বলল - না না কাহিনির ওই অংশটা
তিনি লেখেননি স্বয়ং ভগবান তার
অনুপস্থিতিতে তারই ছদ্মবেশ ধরে পদ্মাবতীর কাছে রাখা পুঁথিতে নিজের হাতে ওসব
কথা লিখে রেখে গেছেন। জয়দেব কিছু কথা চেপে গেলেন, বললেন না যে ওই সুযোগে শ্রীকৃষ্ণ
পদ্মাবতীর চুমু খেয়ে দুপুরবেলায় শোবার ঘরে তার সঙ্গে কোনো ইন্টুমিন্টু করেছিল
কিনা।
আর আমাদের মহাজন পদকর্তাদের অবস্থাটাও একবার ভাবুন কৃষ্ণকে
চুমু খাবে বলে রাধারানির যে অভিসার তার লাইভ-টেলিকাস্ট করার জন্যে পাকা সাংবাদিকের
মতো ঝমঝম বৃষটিতে রাতের ঘূটঘুটে অন্ধকারে কাদাজবজবে পিছল রাস্তায় বজ্রবিদ্যুৎকে
উপেক্ষা করে পুঁথি-কলম হাতে নিয়ে বৃষভানুনন্দিনীর পিছন পিছন ছুটে, তার যাত্রার
খুঁটিনাটি বর্ণনা করে রোম্যান্টিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখে গেল।
এই পসঙ্গে বিদ্যাসুন্দর-এর সুড়ঙ্গ-প্রেমের কথা আর বললাম না।
তবে যে উল্লেখটা না করলেই নয় বৈষ্ণব প্রেমরসে আসক্ত হয়ে
প্রথম বয়সের রবীন্দ্রনাথও লিখে ফেলেছিলেন – সুধীরে মুখানি তুলিয়া চাও! সখি, একটি চুম্বন দাও! গোপনে একটি চুম্বন দাও!